নগরায়ন ও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে রাজশাহী নগরীতে শব্দদূষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নগরীর ব্যস্ত রেইলগেট ও হাসপাতালকেন্দ্রিক লক্ষীপুর মোড়ে সাম্প্রতিক শব্দমাত্রা পরীক্ষায় উভয় স্থানেই ১০০ ডেসিবেলের বেশি গড় সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা পাওয়া গেছে। এতে জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে এবং বারিন্দ এনভায়রনমেন্টের সহযোগিতায় শনিবার (১৫ আগস্ট) রেইলগেট ও লক্ষীপুর মোড়ে শব্দমাত্রা পরিমাপ করা হয়। পরীক্ষায় নেতৃত্ব দেন প্রকৌশলী মোঃ জাকির হোসেন খান (পিএইচডি)। তাকে সহযোগিতা করেন ড. অলি আহমেদ, শামসুর রাহমান শরীফ, মোঃ ওবায়দুল্লাহ, রুমানা আহমেদ, ইফাত আরা, কলি আহমেদ, আবু তারেক বিন আজিজ, রুহুল হাসান পলাশসহ স্বেচ্ছাসেবীরা।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০২২ সাল থেকে একই স্থান ও প্রায় একই সময়সূচিতে রাজশাহী নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ধারাবাহিকভাবে শব্দমাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় শনিবার দিনের ব্যস্ততম সময়ে পরিমাপ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
পরিমাপের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত রেইলগেটে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা ছিল ১০১ দশমিক ৫ ডেসিবেল। এরপর সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত লক্ষীপুর মোড়ে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা পাওয়া যায় ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেল।
গত বছর একই দুই স্থানে সর্বোচ্চ গড় শব্দমাত্রা ছিল প্রায় ৯৭ ডেসিবেল। ফলে এক বছরের ব্যবধানে উভয় এলাকাতেই শব্দদূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর আগে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)-এর ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে রাজশাহীকে বিশ্বের চতুর্থ সর্বাধিক শব্দদূষিত শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে রাজশাহীর শব্দমাত্রা প্রায় ১০৩ ডেসিবেল বলে উল্লেখ করা হয়। নতুন মাঠপর্যায়ের পরিমাপ নগরীতে উচ্চমাত্রার শব্দদূষণের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।
আইন নির্ধারিত সীমার কয়েক গুণ বেশি
বাংলাদেশের শব্দদূষণ বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী শব্দমাত্রার ভিত্তিতে এলাকাকে নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প—এই পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, দিনের বেলায় বাণিজ্যিক এলাকায় অনুমোদিত শব্দমাত্রা ৭০ ডেসিবেল এবং নীরব এলাকায় ৫০ ডেসিবেল।
রেইলগেট বাণিজ্যিক এলাকার অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক হওয়ায় লক্ষীপুর মোড় নীরব এলাকার বৈশিষ্ট্য বহন করে। ফলে দুই এলাকায় পাওয়া ১০১ দশমিক ৫ ও ১০২ দশমিক ৬ ডেসিবেলের শব্দমাত্রা অনুমোদিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি।
অটো ও অযথা হর্নে বাড়ছে শব্দ
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পরিমাপের সময় রেইলগেট ও লক্ষীপুর মোড়ে বিপুলসংখ্যক ব্যাটারিচালিত অটো ও অটোরিকশা চলাচল করছিল। এসব যানবাহনের অনেকগুলোতে উচ্চশব্দের টিটি হর্ন ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রয়োজন না থাকলেও চালকদের বারবার হর্ন বাজাতে দেখা যায়।
রেইলগেট এলাকায় বিভিন্ন বাসকেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে হর্ন বাজাতে দেখা গেছে। পাশাপাশি যত্রতত্র বাস থামানো, অটোরিকশা ও রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং লেন ব্যবস্থাপনার অভাবও চালকদের অহেতুক হর্ন ব্যবহারে উৎসাহিত করছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
হর্ন নিয়ন্ত্রণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দাবি
শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় অনুমোদিত ও নিয়ন্ত্রিত ধরনের হর্ন ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। একই সঙ্গে উচ্চশব্দের টিটি হর্নের ব্যবহার বন্ধ, অটোরিকশা ও রিকশার জন্য নির্দিষ্ট লেন চালু এবং নির্ধারিত স্থান ছাড়া বাস থামানো বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, নগরীর বিভিন্ন সড়কে যৌক্তিক গতিসীমা নির্ধারণ ও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হলে আকস্মিক ব্রেক, তীব্র ত্বরণ এবং অহেতুক হর্নের ব্যবহার কমতে পারে। এতে পরোক্ষভাবেও শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে আসবে।
জনস্বাস্থ্যের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যেরও হুমকি
অতিরিক্ত শব্দ মানুষের শ্রবণশক্তির ক্ষতির পাশাপাশি বিরক্তি, ঘুমের ব্যাঘাত, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত শব্দ পশু-পাখি ও নগর জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শব্দদূষণ কমাতে নগরীর সবুজ বেষ্টনী সম্প্রসারণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, গাছপালা শব্দের বিস্তার কমাতে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই রাজশাহীকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে আম, জাম, নিম, সজনে ও অন্যান্য দেশীয় বৃক্ষের ব্যাপক রোপণ প্রয়োজন।
বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে রাজশাহী নগরীতে শব্দদূষণ পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। বিভিন্ন সময়ে সংগঠনটি শব্দদূষণবিরোধী লিফলেট বিতরণ, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও মানববন্ধনের আয়োজন করেছে।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, চালক ও নগরবাসীকে সম্মিলিতভাবে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জনবহুল এলাকায় ‘অপ্রয়োজনে হর্ন নয়’ নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব রাজশাহী গড়তে শুধু রাস্তা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন যথেষ্ট নয়; শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, সুশৃঙ্খল যান চলাচল এবং পর্যাপ্ত সবুজায়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক