কলকাতার মুসলিম কলোনিতে ৯০ দিনের বেশি পানি নেই, পাশের হিন্দু এলাকায় সরবরাহ স্বাভাবিক

আপলোড সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৯:০৩:২৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৯:০৩:২৯ অপরাহ্ন
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর কলকাতার কাশীপুর এলাকার জ্যোতিনগর কলোনিতে প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে খাবার পানির সংকট চলছে। চিৎপুরের এই কলোনিতে বসবাসকারী প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের অধিকাংশই মুসলিম। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ২৯ মে থেকে পানি সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় পানি আসছে নিয়মিত।

কলোনির বাসিন্দারা বলছেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির নির্দেশেই পানি কেটে দেওয়া হয়েছে বলে তাদের দাবি। তারা বলছেন, বিধায়ক নিজেই বলেছেন যে এই কলোনির মানুষ তাকে ভোট দেয়নি বলেই এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে রিট পিটিশন করা হলেও এখনো কোনো প্রতিকার মেলেনি।

দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদক কলোনিতে গিয়ে দেখেছেন, বাড়ির সামনে রাখা পানির পাত্রগুলো সব শুকনো। কয়েকজন কিশোরী খালি পাত্র নিয়ে ভ্যানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের প্রতিদিন দেড় কিলোমিটার হাঁটতে হয় পানির খোঁজে। কখনো টাকা দিয়ে কিনতে হয়, কখনো পাশের হিন্দু বস্তি থেকে এক-আধ বালতি পানি পাওয়া যায়। কিন্তু সেখানকার বাসিন্দারাও ভয় পাচ্ছেন,মুসলিম প্রতিবেশীদের সাহায্য করলে তাদের পানিও কেটে দেওয়া হতে পারে।

কলোনির বাসিন্দা আকবর আলী বলেন, পানি কেন বন্ধ? কারণ আমরা মুসলমান। বহুবার বোরো অফিস আর থানায় জানিয়েছি, কোনো ফল হয়নি। রশমিলা খাতুন বলেন, মানুষ বাধ্য হয়ে গঙ্গায় গোসল করছে। তাতে চর্মরোগ হচ্ছে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না। বৃদ্ধ ও অসুস্থরা চরম কষ্টে আছেন। তিনি বলেন, আমরা সবকিছুর জন্যই নদীর পানি ব্যবহার করছি। দেখুন কত ময়লা। ছয়-সাত মাসের শিশুদেরও এই পানিতে গোসল করানো হচ্ছে। তাদের শরীরে র‍্যাশ হচ্ছে।

আরেক বাসিন্দা রিক্তা বিবি জানান, কয়েকদিন আগে এক প্রতিবেশী মারা যান। দাফনের আগে মৃতদেহ গোসল করানোর জন্যও পানি ছিল না। শেষে নদীর নোংরা পানি দিয়েই কাজ সারতে হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, পানি সরবরাহ আগে স্বাভাবিক ছিল। কোনো অভিযোগও ছিল না। জুলাইয়ের শেষদিকে কলকাতা পুরসভা পাইপলাইনের কাজ করে। বাসিন্দা মহিনুদ্দীন শেখ বলেন, বস্তির শুরুতে আর শেষে দুটো গর্ত খুঁড়েছিল। ২৮ জুলাই রাত এগারোটার দিকে পানি বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আর খোলেনি। ওই দুই স্থানের মাঝখানের পুরো এলাকায় পানি নেই। কিন্তু ঠিক আগে ও পরে থাকা কলগুলোতে পানি আসছে, যেগুলো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায়।

কলোনিতে দীর্ঘদিন ধরে থাকা হিন্দু বাসিন্দা সরস্বতী বিশ্বাস বলেন, দুই-তিন বছরের বাচ্চারা নদীর ধারে নেমে যাচ্ছে। কয়েকদিন আগে এক শিশু প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। কিছু হলে দায় কে নেবে? তিনি আরও বলেন, নতুন বিধায়ক তাদের ‘বাংলাদেশি ও অবৈধ দখলদার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আমি কীভাবে বাংলাদেশি? আমার পূর্বপুরুষরা এখানে থাকতেন। আমার কাগজপত্র আছে, এবারও ভোট দিয়েছি।

বাসিন্দারা মনে করছেন, পানি ও বিদ্যুৎ কেটে দেওয়া উচ্ছেদের পরিকল্পনার অংশ। কলোনির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর বিশ্বাস বলেন, মৌলিক চাহিদা বন্ধ করে আমাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। মর্জিনা বেগমও একই কথা বলেন।

কয়েকজন নারী বিধায়কের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তারা অভিযোগ করেন, বিধায়ক তাদের গালিগালাজ করেছেন এবং ধর্মীয় অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন। এক বয়স্ক নারী বলেন, তিনি তুই-তোকারি করে বললেন,তোরা কেন মসজিদ বানিয়ে আল্লাহকে ডাকিস? ঘরে বসে প্রার্থনা করতে পারিস না? যা এখান থেকে। আমি তোদের পানি বন্ধ করিনি, কিছুই করতে পারব না। স্বাতী বিবি বলেন, বিধায়ক বলেছেন জমি কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের, তারা জবরদখল করে আছেন। এ কারণেই পানি ও আগে বিদ্যুৎ কেটে দেওয়া হয়েছিল।

বাসিন্দারা কলকাতা হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। সিটি সিভিল কোর্টেও উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা চেয়েছিলেন। কিন্তু গত ১৮ আগস্ট আদালত কোনো সুরক্ষা দেয়নি। বাবু গাজী প্রশ্ন করেন, আমাদের বস্তি নিবন্ধিত। হঠাৎ করে কীভাবে পোর্ট ট্রাস্টের জমি হয়ে গেল? সত্তর বছরে কেউ তো বলেনি আমরা জবরদখলকারী।

বিধায়ক রীতেশ তিওয়ারির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জমি বন্দর কর্তৃপক্ষের। মানুষের সঙ্গে বন্দরের বিরোধ চলছে। হাইকোর্ট সাময়িকভাবে জোরজুলুম না করার নির্দেশ দিয়েছেন। পানি সরবরাহ করে কেএমসি। আমার ভূমিকা কী? পানি চালু করতে সাহায্য করতে পারবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি আমার কাজ নয়। তারা অন্য নেতাদের কাছে গেছে। তাদের ওপরই আস্থা রাখা উচিত।

কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কমিশনার ও পোর্ট ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।

সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন হাইকোর্ট বারবার বলেছে, পানি মৌলিক অধিকার। কোনো অবস্থাতেই কাউকে বঞ্চিত করা যায় না। তারপরও জ্যোতিনগর কলোনির মানুষ প্রায় তিন মাস ধরে পানিহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

সম্পাদকীয় :

Publisher & Editor :Md. Abu Hena Mostafa Zaman

Mobile No: 01971- 007766; 01711-954647

রাজশাহীর সময় অনলাইন নিউজ পোর্টাল আবেদনকৃত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, ঢাকা ।

অফিস :

Head office: 152- Aktroy more ( kazla)-6204 Thana : Motihar,Rajshahi

Email : [email protected],                    [email protected]