০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, সোমবার, ০১:০৯:০৯ অপরাহ্ন


রাবির অনশনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, আহত ৫
রাবি প্রতিনিধি
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৫-১২-২০২২
রাবির অনশনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, আহত ৫ রাবির অনশনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, আহত ৫


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উর্দু বিভাগে ‘শিক্ষক রাজনীতির’ কারণে ফল বিপর্যয় হয়েছে অভিযোগ তুলে প্রশাসনের তদন্ত ও সমাধানের দাবি জানিয়ে আমরণ অনশনে বসা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। এতে অন্তত ৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। 

সোমবার (৫ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসন ভবনের সামনে এই ঘটনা ঘটে। তবে কারা এই হামলা চালিয়েছে, তা পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চিত করতে পারেনি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে উপ-উপাচার্য সুলতান-উল-ইসলাম অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এবং আগামীকাল (মঙ্গলবার) সকালে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত সমাধান করা হবে বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন। এদিকে আজকের মধ্যেই সমাধান না হলে অনশন ভাঙবেন না বলে শিক্ষার্থীরা জানান। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা উপ-উপাচার্যের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এ সময় উপ-উপাচার্যের পিছনে থাকা প্রশাসনের অন্য শিক্ষকরা তাদের সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। অবস্থা দেখে অনশনরত মেয়ে শিক্ষার্থীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং একজন মেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যালে নেওয়া হয়।

এর আগে সোমবার সকাল ১০টা থেকে শিক্ষার্থীরা অনশন কর্মসূচি শুরু করেন। কর্মসূচি থেকে দাবি না মানা পর্যন্ত তারা অনশন চালিয়ে যাবার ঘোষণা দেন। কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের হাতে ‘আমরণ অনশন চলবে, প্রাপ্য ফলাফল ফিরিয়ে দিতে হবে, ছাত্রদের উপর হুমকি ধামকির বিচার চাই, ছাত্রবান্ধব বিভাগ চাই’ শীর্ষক প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। এ সময় ওই বিভাগের ২০-২৫ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।

উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ফারুক হোসেন বলেন, আমাদের মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। আগে ছিলো একটা ডিপার্টমেন্ট এখন পুরো ডিপার্টমেন্ট আমরা অবস্থান নিবো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গায়ে হাত দেওয়ার জবাব আমরা চাই। তাদের অনশন এখন আরও তীব্র হবে বলে জানান তিনি।

উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী রাম প্রশাদ জয় বলেন, প্রশাসন যুক্তিসঙ্গত কথা বলেছেন ভালো কথা কিন্তু তাদের গায়ে হাত তোলার সাহস তারা কোথায় পায়। এর বিচার না হওয়া পর্যন্ত আমাদের পুরো ডিপার্টমেন্ট একাত্মতা পোষণ করে আন্দোলন গড়ে তুলবো। শিক্ষার্থীরা এক হয়ে তীব্র আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনশনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে তাদের এই ফল বিপর্যয় হয়েছে। তাদের দাবি, শিক্ষকরা যে পন্থি রাজনীতি করেন, বিপরীতপন্থি শিক্ষকদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পর্ক ভালো থাকলে ওই পন্থি শিক্ষক তার সাবজেক্টে (বিষয়) নম্বর কম দেন। এছাড়াও এক শিক্ষকের কোনো প্রোগামে গেলে অন্য শিক্ষক নম্বর কমিয়ে দেন বলেও দাবি শিক্ষার্থীদের। 

তারা বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা এ সময় দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে তৃতীয় বর্ষে উঠে গেছে। কিন্তু আমরা এখনো দ্বিতীয় বর্ষের ক্লাস করতে পারিনি প্রথম বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারের ফল বিপর্যয়ের কারণে। আমাদের প্রথম সেমিস্টারে আমাদের বিভাগে প্রথম স্থান অধিকারকারীর সিজিপিএ ছিলো ৩.৯১। কিন্তু দ্বিতীয় সেমিস্টারে তার সিজিপিএ হয়েছে ৩.২৮।

তারা আরও জানান, একজন ৩ পয়েন্ট সিজিপিএ এবং ৬ জন সিজিপিএ ৩ এর উপরে পেয়েছে। কিন্তু প্রথম সেমিস্টারে মাত্র ৫ জনের মতো শিক্ষার্থী ৩ পয়েন্টের নিচে সিজিপিএ পেয়েছিলো। কিন্তু এবার বিভাগের ৩৮ জন শিক্ষার্থীর সকলেরই ফল বিপর্যয় হয়েছে। এর মধ্যে ৮ জন ইয়ার ড্রপ হয়েছে। সর্বনিম্ন সিজিপিএ ২ পয়েন্ট। এতো বাজে রেজাল্ট হওয়ার কথা ছিলো না।

উর্দু বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম বলেন, দ্বিতীয় সেমিস্টারে আমাদের ফলাফল বিপর্যয় হয়েছে। কিন্তু একই ব্যাচের প্রথম সেমিস্টারের ফলাফল উর্দু বিভাগের ইতিহাসে সব থেকে ভালো হয়েছিল। এর ফলে আমরা শিক্ষকদের নজরে চলে আসি। পরবর্তী সময়ে শিক্ষকরা বলতেন, ‘তোমাদের ফলাফল কীভাবে এতো ভালো হয়। সামনের পরীক্ষায় দেখা যাবে, রেজাল্ট কিভাবে এতো ভালো হয়। কাগজে কলমে দেখায় দিবো। উপর থেকে নিচে কীভাবে নামাতে হয় এটা আমাদের জানা আছে।’ এসব কথা আমাদের বলতেন শিক্ষকরা। 

এছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের হুমকি দিতেন। গত তিন মাস ধরে আমাদের সমস্যা সমাধানের কথা বলে ১০-১২ বার সময় নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাই এবার যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো সমাধান পাবো ততক্ষণ পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাবো।

আব্দুর রহমান নামের একই শিক্ষাবর্ষের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এ বিষয়ে প্রশাসন প্রতিবার সময় নেয়। কিন্তু কোনো সমাধান হচ্ছে না। আজকে না, সাতদিন পরে আসো, আমাদের আর কিছুদিন সময় দাও। এসব বলে তারা কালক্ষেপণ করছে। এবার আর আমরা কোনো আশ্বাস মানবো না। যতোদিন না ফলাফল ঠিক করা হবে ততোদিন পর্যন্ত আমরা আমাদের অনশন চালিয়ে যাবো। এতে মরণ হলে হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা এম. তারেক নূরকে ফোন করলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

উর্দু বিভাগের সভাপতি ড. মো. আতাউর রহমান বলেন, বিষয়টা নিয়ে বিভাগের শিক্ষকদের সঙ্গে কয়েকবার সভা করেছি। ভর্তি কমিটি প্রতিবেদনও দাখিল করেছে। প্রতিবেদনেও এই ফলাফল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য আমরা উর্দু বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে মিটিং করেছি। তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছি, শিক্ষার্থীদেরকে শ্রেণিকক্ষে ফেরত নিয়ে যেতে। এছাড়া ফল বিপর্যয়ের এই ঘটনা তদন্ত করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে। 

উর্দু বিভাগের প্রথমবর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টারে ৩৮ জন পরীক্ষায় অংশ নেন। তার মধ্যে ১৭ জন ফেল করেছে। বাকিদের ফলাফলও খুবই খারাপ। তাদের দাবি, বিভাগের শিক্ষকদের মধ্যকার রাজনীতির কারণে ফলাফলের এমন অবস্থা। এ নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে অভিযোগ করলে একাধিকবার আশ্বাস দিলেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা অনশন শুরু করেছেন। দ্রুত সমাধান না পেলে আমরণ অনশন চালিয়ে যাবেন আন্দোলনকারীরা।