০৬ ডিসেম্বর ২০২২, মঙ্গলবার, ০২:৪৪:১১ অপরাহ্ন


চাঁনাচুর ফ্যাক্টরীতে ৫০হাজার টাকা চাঁদা দাবি, র‌্যাবের জালে দুই ভুয়া সাংবাদিক
স্টাফ রিপোর্টার:
  • আপডেট করা হয়েছে : ১৯-০৮-২০২২
চাঁনাচুর ফ্যাক্টরীতে ৫০হাজার টাকা চাঁদা দাবি, র‌্যাবের জালে দুই ভুয়া সাংবাদিক চাঁনাচুর ফ্যাক্টরীতে ৫০হাজার টাকা চাঁদা দাবি, র‌্যাবের জালে দুই ভুয়া সাংবাদিক


বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টা। রাজশাহী নগরীতে আব্দুর রশিদ চানাচুর ফ্যাক্টরীর গেটে বাড়ি দিচ্ছে দুই সাংবাদিক। ফ্যাক্টরীর মালিক আব্দুর রশিদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে জানতে চান বাবা আপনারা কারা? উত্তরে দুই যুবক জানায়, আমরা সাংবাদিক। এ সময় তারা বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে এই চানাচুর ফ্যাক্টরী অবৈধ। তাই আমারা ভেতরে ঢুকবো ছবি তুলবো এবং আপনার ফ্যাক্টরীর নামে নিউজ করবো।

ফ্যাক্টরীর মালিক আব্দুর রশিদ বলেন , বাবা আপনারা দিনে আসেন আপনাদের প্রয়োজনীয় সকল কাগজ দেখাবো। কিন্তু সাংবাদিক নাছোড় বান্দা। তারা জোর করে প্রবেশ করেন ফ্যাক্টরীর ভেতেরে। দুমদাম ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারন করেন। এরপর ফ্যাক্টরীর মালিকের ছেলে মোঃ আতিউল্লাহ বাড়ির ভেতর থেকে হৈচৈ শুনে বাইরে আসেন।

জানতে চান কি হয়েছে ভাই। তারা পরিচয় দেন আমরা সাংবাদিক। আপনি একটু সাইডে আসেন আলাপ করি। পাশে ডেকে মালিকের ছেলেকে সাংবাদিক পরিচয় দানকারী বকতিয়ার শাহারিয়ার লিয়ন বলেন আমি জিবিসি (GBC) চ্যানেলের সাংবাদিক। আর অপর জন রনি আহম্মেদ বলেন, আমি দৈনিক জনতার বাংলা পত্রিকার সাংবাদিক। 

এরপর তারা বলেন, আমরা আপনাদের ফ্যক্টরী নিয়ে নিউজ করলে আপনাদের ফ্যক্টরী বন্ধ হয়ে যাবে। মামলাও হবে আপনার বাবার নামে। তাই আমাদের ৫০ হাজার টাকা দেন আমরা কোন নিউজ করবো না। কিন্তু টাকা না দিলে সমস্যা আছে বলে হুমকি দেন ওই দুই সাংবাদিক।

এভাবেই পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেন, চানাচুর ফ্যক্টরীর মালিক আব্দুর রশিদ ও তার ছেলে, রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী মোঃ আতিউল্লাহ।

ঘটনাটি ঘটে রাজশাহী নগরীর কাটাখালি থানার কাপাসিয়া গ্রামে অবস্থিত আব্দুর রশিদ চানাচুর ফ্যাক্টরীতে। পরে খবর পেয়ে ফ্যক্টরীর মালিকের জামাই সেখানে যান। 

বিষয়টি কাটাখালি থানার ওসি মোঃ সিদ্দিকুর রহমানকে মুঠো ফোনে অবগত করেন। সাথে সাথে ওসির নির্দেশে ঘটনস্থলে পৌঁছায় এএসআই জয়নাল ও সঙ্গীয় পুলিশ ফোর্স। পরে ফ্যক্টরীর মালিকের জামাই ওই দুই যুবকের সাথে কথা বলে জানতে পারেন তারা সাংবাদিক তাই আপোষ মিমাংসার লক্ষ্যে কাটাখালি থানার ওসিকে পূণরায় ফোন দিয়ে পুলিশ প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করেন তিনি। সাথে সথে পুলিশ প্রত্যাহার করে নেন ওসি। 

ততক্ষনে ৫০/৬০জন স্থানীয় বাসিন্দারা সেখানে জড়ো হন। তারা নাছোড় বান্দা।

সাংবাদিক পরিচয় দানকারি দুই চাঁদাবাজকে শুরু করেন নতুন ভাবে প্রশ্ন পর্ব। ওই সময় মহাসড়ক দিয়ে র‌্যাব-৫, এর, একটি টহল দল যাচ্ছিলেন। মানুষের ভিড় দেখে তারা তাদের পিকআপ ভ্যানটি থামিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তাদের দক্ষতা ও বিচক্ষনতা দিয়ে দুই কথিত সাংবাদিককে প্রশ্ন শুরু করেন। দেখতে চান তাদের (আইডি কার্ড) পরিচয় পত্র । 

সাংবাদিক পরিচয় দানকারী বকতিয়ার শাহারিয়ার লিয়নের কাছে জানতে চান, কোন পত্রিকার সাংবাদিক ? উত্তরে তিনি জানান জিবিসি (GBC) চ্যানেলের সাংবাদিক। (GBC) এটা কি ! উত্তরে আইপি চ্যানেল।  সরকার কতৃক অনুমোদন আছে ? নাই। পড়াশোনা কতদুর ৮ম শ্রেণী পাশ। এরপর অপর জন রনি আহম্মেদ বলেন, আমি দৈনিক জনতার বাংলা পত্রিকার সাংবাদিক। পড়া শোনা ? ৮র্ম শ্রেণী পাশ। কার্ড চেক করে দেখেন মেয়াদ নাই।

রাজশাহীতে পেপার কোথায় পাওয়া যায় ? উত্তরে তিনি বলেন, ঢাকা থেকে কার্ড (পরিচয় পত্র) কিনেছি তবে রাজশাহীতে পত্রিকা আসে না। আইডিতে উল্লেখ রয়েছে শাহমখদুম থানা প্রতিনিধি। (কিন্তু গেছেন কাাঁখালি থানা এলাকায়)।

র‌্যাব ? রাতে প্রতিষ্ঠানে কেন এই এসেছেন এবং ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হবে কেন? এমন প্রশ্নের কোন উত্তরে তারা বলেন, আমরা সাংবাদিক যে কোন সময় যে কোন স্থানে যেতে পারি। (অর্থাৎ সুপ্রিম পাওয়ার)।

র‌্যাব ? এখানে কে পাঠিয়েছে?  আমাদের সম্পাদক রকি স্যার পাঠিয়েছেন।

এরপর র‌্যাব জানতে চান ফ্যাক্টরীর মালিকের কাছে এত মানুষ কেন ? উত্তরে তিনি উপরোক্ত ঘটনাগুলির বর্ননা করেন। পরিশেষে গুনধর ৮র্ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়া সাংবাদিক পরিচয়দানকারি দুই ভুয়া সাংবাদিককে হাতকড়া পারিয়ে দেন র‌্যাব। 

এ সময় তাদের কাছ থেকে ২টি মাইক্রোফোন, ২টি ক্যাবল, ২টি ভূয়া পরিচয়পত্র, ২টি মোবাইল, ৪টি সীমকার্ড, চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত ১টি মোটরসাইকেল জব্দ করা করা হয়।

ফ্যাকক্টরীর মালিক মামলা করবে বলে জানালে রাত সাড়ে ১০ টায় তাকেও পিকআপ ভ্যানে তুলে র‌্যাব-৫, অফিসে রওনা দেন র‌্যাবের ওই টহল দলটি।

এদিকে, উপস্থিত জনতা বলেন, জমিতে, দোকানে, হাটে, বাজারে কাজের লোক পাওয়া যাচ্ছে না। আর চিট বাটফারী কার্ড বানিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছে এক শ্রেণীর বাটফার ও বখাটেরা। তাও আবার ৮ম শ্রেণী পাশ। 

তারা আরও বলেন, আগে সাংবাদিক তেমন দেখা যেত না। এখন রাস্তায় বেরুলে সাংবাদিক গায়ের সাথে বাড়ি খায়। এই জাতের সংখ্যা ব্যপক বেড়েছে। তদন্ত করে এদের মতো ভুঁইফোড় সাংবাদিক এবং হাটে বাজারে, গ্রামঞ্চলের বিস্কুট , চানাচুর ফ্যাক্টরী, ইটভাটা, পুকুর খনন, সাংবাদিক পরিচয়ে ভুয়া ম্যাজিস্ট্রেট সহ যারা পত্রিকায় কাজ করেনা তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান স্থানীয়রা। সেই সাথে র‌্যাবকে ধন্যবাদ জানান দুই ভুয়া সাংবাদিক ও ফাঁপড়বাজকে গ্রেফতারের জন্য।

 শুক্রবার সকাল ১১টায় র‌্যাব-৫, রাজশাহী মোল্লা ক্যাম্পের পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। 

গ্রেফতার দুই ভুয়া সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চানাচুর ফ্যক্টরীর মালিক বাদি হয়ে একটি চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করেছেন।

গ্রেফতারকৃত ভুয়া সাংবাদিকরা হলো: মহানগরীর শাহমখদুম থানার বড়বনগ্রাম নামুপাড়া (১৭নং ওয়ার্ড), এলাকার মোঃ ইনতাজ আলীর ছেলে মোঃ রনি আহম্মেদ (২৬) (সে দৈনিক জনতার বাংলা কার্ডধারী) এবং রাজপাড়া থানার মহিষবাতান পূর্বপাড়া এলাকার (জনৈক মোঃ মোজাম্মেলের বাসার ভাড়াটিয়া) মনোয়ার হোসেন মানুর ছেলে মোঃ বখতিয়ার শাহরিয়ার নিলয় (১৯) (সে (GBC)বাংলা কার্ডধারী)।

শুক্রবার সকালে তাদের সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে বলেও জানায় র‌্যাব।